মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
The Dhaka News Bangla

আনন্দের আলোয় শিক্ষা: চাপমুক্ত প্রজন্মের প্রত্যাশা ও বাস্তবতা

আনন্দের আলোয় শিক্ষা: চাপমুক্ত প্রজন্মের প্রত্যাশা ও বাস্তবতা
সাংবাদিক ও কলামিস্ট ওসমান গনি

আধুনিক সভ্যতার এই রমরমা যুগে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এক অন্তহীন প্রতিযোগিতার চক্রে আবর্তিত হচ্ছে। সকালে ভারী স্কুল ব্যাগ কাঁধে নিয়ে ছুটে চলা শিশুটির ক্লান্ত মুখ কিংবা জিপিএ-৫ পাওয়ার অলৌকিক চাপের নিচে পিষ্ট হওয়া কিশোরটির মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা আজ এক নির্মম বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে সমাজকে। শিক্ষা মানে যেখানে হওয়ার কথা ছিল জ্ঞানের আলোয় মনকে প্রসারিত করা, কৌতূহলকে উসকে দেওয়া এবং আলোর মিছিলে শামিল হওয়া, সেখানে শিক্ষা আজ এক আতঙ্কজনক প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। অথচ এই অচলাবস্থা থেকে উত্তরণের সর্বজনস্বীকৃত এবং পরীক্ষিত চাবিকাঠি হলো ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ বা আনন্দের মাধ্যমে শিক্ষা। শিক্ষাকে যখন ভয়ের বেড়াজাল থেকে মুক্ত করে আনন্দের চাদরে মুড়ে দেওয়া হয়, তখন তা কেবল একটি প্রক্রিয়া থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে মানবসত্তার স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশের এক চমৎকার মাধ্যম।

মানবশিশুর জন্মগত বৈশিষ্ট্যই হলো কৌতূহল। সে চারপাশের প্রকৃতি, রঙ, শব্দ এবং গন্ধের মধ্য দিয়ে নতুন কিছু জানতে চায়, বুঝতে চায়। কিন্তু আমাদের প্রচলিত সমাজব্যবস্থা এবং প্রাচীন মেমোরি বেসড বা মুখস্থ নির্ভর শিক্ষাপদ্ধতি শিশুদের এই সহজাত কৌতূহলকে গলা টিপে হত্যা করে। ক্লাসরুমগুলো যেন একেকটি বন্দিশালা, যেখানে শিক্ষককের একঘেয়ে লেকচার আর মুখস্থ করার নিরন্তর তাড়া শিক্ষার্থীকে পড়াশোনার প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তোলে। এই ভীতিপ্রসূত পরিবেশে জ্ঞান অর্জনের চেয়ে নম্বর অর্জনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা মুখ্য হয়ে ওঠে। যখন একটি শিশু পরীক্ষার ভয়ে কুঁকড়ে থাকে বা হোমওয়ার্ক না করার অপরাধবোধে ভোগে, তখন তার মস্তিষ্কের সৃজনশীল অংশটি অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। এর বিপরীতে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ ধারণার মূল দর্শন হলো শিক্ষার্থীর মনস্তাত্ত্বিক স্বস্তি। আনন্দঘন পরিবেশে যখন কোনো বিষয় উপস্থাপন করা হয়, তখন মস্তিষ্কে ডোপামিন ও অক্সিডোসিনের মতো পজিটিভ হরমোন ক্ষরিত হয়, যা শেখার প্রক্রিয়াকে দীর্ঘস্থায়ী ও আকর্ষণীয় করে তোলে।

আনন্দময় শিক্ষার প্রকৃত রূপ কেবল শ্রেণিকক্ষের চার দেওয়ালে সীমাবদ্ধ নয়; এটি প্রকৃতির বুক থেকে শুরু করে খেলার মাঠ এবং দৈনন্দিন জীবনের নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে বিস্তৃত। প্রাচীনকালে আমাদের দেশে বা গুরুগৃহে শিক্ষার পরিবেশ কেমন ছিল তা স্মরণ করলে দেখা যায়, উন্মুক্ত প্রকৃতি গাছের ছায়ায় গুরুর সান্নিধ্যে জীবনের পাঠ নেওয়া হতো খেলাধুলা, গল্প ও বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শান্তিনিকেতন বা বিশ্বভারতীর আদর্শে এই আনন্দময় শিক্ষার সুর স্পষ্টভাবে বেজে উঠেছিল, যেখানে ছাতিম তলার মুক্ত বাতাসে শিক্ষার্থীরা প্রকৃতির সান্নিধ্যে গান, নাটক ও সৃজনশীল কাজের মধ্য দিয়ে জ্ঞান অর্জন করত। আজকের দিনেও ফিনল্যান্ড বা জাপানের মতো উন্নত দেশগুলোর শিক্ষাব্যবস্থায় এই দর্শনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। সেখানে শিশুদের ওপর কোনো অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা হয় না, হোমওয়ার্কের বোঝা চাপানো হয় না, বরং খেলাধুলা, প্র্যাকটিক্যাল প্রজেক্ট এবং সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের ভেতরের প্রতিভা ফুটিয়ে তোলা হয়।

আমাদের সমাজে প্রায়শই একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে যে, পড়াশোনায় আনন্দ যুক্ত হলে পড়াশোনার মান বা গুরুত্ব কমে যায়। অভিভাবকরা মনে করেন, শাসন, ভয়ভীতি এবং কড়া অনুশাসন না থাকলে সন্তান পড়ালেখা করবে না। এই ভ্রান্ত ধারণার কারণে শৈশব থেকেই শিশুদের ওপর এক নিষ্ঠুর মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হয়। খেলার মাঠ থেকে কেড়ে নিয়ে তাদের কোচিং সেন্টার আর প্রাইভেট মাস্টারের বেড়াজালে বন্দি করা হয়। ফলাফলস্বরূপ, আমাদের শিশুরা সার্টিফিকেটসর্বস্ব শিক্ষিত হয়ে উঠলেও তাদের মধ্যে মৌলিক চিন্তার শক্তি বা উদ্ভাবনী ক্ষমতা অনেক ক্ষেত্রেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারা মুখস্থ বিদ্যা দিয়ে পরীক্ষার গণ্ডি পার হতে পারলেও বাস্তব জীবনের জটিল সমস্যাগুলো সমাধান করতে গিয়ে হোঁচট খায়। অথচ আনন্দময় শিক্ষার মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান কখনো ভোলা যায় না, কারণ তা মানুষের হৃদয়ের গভীর গ্রথিত হয়ে যায়। যখন কোনো শিক্ষার্থী গণিতকে একটি ভয়ের বিষয় না ভেবে একটি আকর্ষণীয় ধাঁধা হিসেবে নেয়, বিজ্ঞানকে জটিল সূত্র না ভেবে চারপাশের রহস্য উদ্ঘাটনের আনন্দ হিসেবে দেখে, তখন পড়াশোনা আর বোঝা থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে পরম প্রাপ্তি।

শিক্ষায় আনন্দের এই ধারা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে শিক্ষকদের ভূমিকা সবচেয়ে অগ্রণী। একজন শিক্ষক কেবল তথ্য সরবরাহকারী নন, তিনি একজন মেন্টর বা নির্দেশক যিনি শিক্ষার্থীর মনের ভেতর সুপ্ত থাকা সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তুলতে পারেন। গতানুগতিক মুখস্থ করানোর মানসিকতা থেকে বেরিয়ে শিক্ষকদের আধুনিক ও সৃজনশীল শিক্ষণ কৌশল আয়ত্ত করতে হবে। গল্পের ছলে কঠিন ব্যাকরণ বোঝানো, নাট্যাভিনয়ের মাধ্যমে ইতিহাসের কোনো ঘটনা ফুটিয়ে তোলা কিংবা বিজ্ঞানাগারের বাইরে খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে প্রকৃতি পর্যবেক্ষণের সুযোগ করে দেওয়া, এসব কৌশল শিক্ষাকে প্রাণবন্ত করে তোলে। যখন শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের ভুল করার স্বাধীনতা দেন এবং প্রতিটি ছোট সাফল্যকে উৎসাহ ও প্রশংসার সাথে বরণ করেন, তখন শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বেড়ে যায়। ভয়হীন ক্লাসরুমে শিক্ষার্থী প্রশ্ন করতে শেখে, যুক্তি দেখাতে শেখে এবং নিজের মতামত স্বাধীনভাবে প্রকাশ করার সাহস পায়।

পরিবার হলো শিশুর প্রথম পাঠশালা এবং মা-বাবা হলো তার প্রথম শিক্ষক। তাই আনন্দময় শিক্ষার পরিবেশ তৈরিতে অভিভাবকদের মানসিকতার পরিবর্তন সবার আগে প্রয়োজন। সন্তানের রেজাল্ট নিয়ে প্রতিবেশী বা আত্মীয়স্বজনের সাথে অসুস্থ তুলনা করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সন্তান পরীক্ষায় কত নম্বর পেল তার চেয়ে বড় কথা হলো সে প্রতিদিন নতুন কিছু শিখতে পেরে আনন্দ পেল কি না, তা অনুধাবন করা জরুরি। ছুটির দিনে সন্তানকে সারাদিন পড়ার টেবিলে আটকে না রেখে তাকে খেলার মাঠে যেতে দেওয়া, বই পড়ার আনন্দ উপভোগ করানো এবং প্রকৃতির সাথে মেশার সুযোগ করে দেওয়া উচিত। যৌথ পরিবার কিংবা পারিবারিক আড্ডায় গল্প বলার মাধ্যমে পারিবারিক মূল্যবোধ ও নৈতিক শিক্ষা দেওয়ার যে ঐতিহ্য আমাদের সংস্কৃতিতে ছিল, তা ফিরিয়ে আনা দরকার। যখন ঘরে এবং বাইরে শিশু একটি নিরাপদ, স্নেহময় ও আনন্দঘন পরিবেশ পায়, তখন তার মানসিক বিকাশ সুষম হয়।

ডিজিটাল যুগের এই সময়ে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমেও শিক্ষাকে দারুণভাবে আনন্দময় করে তোলা সম্ভব। অ্যানিমেশন, কার্টুন, শিক্ষামূলক ভিডিও গেম এবং ইন্টারঅ্যাক্টিভ অ্যাপস আজ শিক্ষার ধারণাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরে কার্টুনের চরিত্রের মাধ্যমে বর্ণমালা বা নামতা শেখানোর পদ্ধতি শিশুদের দারুণভাবে আকৃষ্ট করে। তবে এই ডিজিটাল মাধ্যম যেন আবার স্ক্রিন টাইমের অতিরিক্ত আসক্তিতে পরিণত না হয়, সেদিকেও সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। প্রযুক্তিকে সহায়ক শক্তি হিসেবে ব্যবহার করে পড়াশোনাকে আরও আকর্ষণীয় ও সহজলভ্য করে তোলা যেতে পারে, যা প্রথাগত পাঠ্যপুস্কের একঘেয়েমি দূর করতে দারুণ ভূমিকা রাখে।

আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় আনন্দময় শিক্ষার এই ধারণাটিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য নীতিনির্ধারক ও শিক্ষা প্রশাসনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন শিক্ষাক্রমে পারফরম্যান্স-ভিত্তিক মূল্যায়ন এবং কন্টিনিউয়াস অ্যাসেসমেন্টের ওপর যে জোর দেওয়া হয়েছে, তা সঠিক ও আন্তরিকভাবে বাস্তবায়িত হলে মুখস্থ বিদ্যার অভিশাপ থেকে মুক্তি মিলবে। তবে এর পাশাপাশি শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, ক্লাসরুমের পরিবেশ উন্নয়ন এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত যুক্তিসঙ্গত পর্যায়ে নামিয়ে আনা জরুরি। বড় বড় শহরগুলোর পাশাপাশি মফস্বল ও গ্রামবাংলার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতেও যদি আনন্দময় শিক্ষার পর্যাপ্ত উপকরণ ও মনোরম পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়, তবেই সত্যিকার অর্থে শিক্ষার সুফল সর্বস্তরের মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাবে।

একটি জাতির মেরুদণ্ড শক্তিশালী করার জন্য প্রয়োজন একটি সুস্থ, সবল ও সৃজনশীল প্রজন্ম। যে শিশু শৈশবে আনন্দ নিয়ে পড়াশোনা করতে শেখে, সে বড় হয়ে একজন কৌতূহলী গবেষক, দক্ষ পেশাজীবী এবং মানবিক গুণসম্পন্ন আদর্শ নাগরিক হয়ে গড়ে ওঠে। ভীতি ও প্রতিযোগিতার যাতাকলে পিষ্ট হয়ে আমাদের আগামী ভবিষ্যৎ যেন হারিয়ে না যায়, সেদিকে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি সচেতন নাগরিককে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। শিক্ষাকে কোনো শাস্তিমূলক বাধ্যবাধকতা নয়, বরং জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য আনন্দের অনুষঙ্গ হিসেবে গ্রহণ করার সময় এখনই। আসুন, আমরা সকলে মিলে এমন একটি শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলি যেখানে প্রতিটি শিশুর শৈশব হাসিখুশিতে মুখরিত থাকবে এবং জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে পড়বে প্রতিটি হৃদয়ে আনন্দ ও উদ্দীপনার স্ফুলিঙ্গ হয়ে।

যুক্ত থাকুন দ্যা ঢাকা নিউজের সাথে

The Dhaka News Bangla

মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬


আনন্দের আলোয় শিক্ষা: চাপমুক্ত প্রজন্মের প্রত্যাশা ও বাস্তবতা

প্রকাশের তারিখ : ২৭ অক্টোবর ২০২৬

featured Image
আধুনিক সভ্যতার এই রমরমা যুগে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এক অন্তহীন প্রতিযোগিতার চক্রে আবর্তিত হচ্ছে। সকালে ভারী স্কুল ব্যাগ কাঁধে নিয়ে ছুটে চলা শিশুটির ক্লান্ত মুখ কিংবা জিপিএ-৫ পাওয়ার অলৌকিক চাপের নিচে পিষ্ট হওয়া কিশোরটির মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা আজ এক নির্মম বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে সমাজকে। শিক্ষা মানে যেখানে হওয়ার কথা ছিল জ্ঞানের আলোয় মনকে প্রসারিত করা, কৌতূহলকে উসকে দেওয়া এবং আলোর মিছিলে শামিল হওয়া, সেখানে শিক্ষা আজ এক আতঙ্কজনক প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। অথচ এই অচলাবস্থা থেকে উত্তরণের সর্বজনস্বীকৃত এবং পরীক্ষিত চাবিকাঠি হলো ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ বা আনন্দের মাধ্যমে শিক্ষা। শিক্ষাকে যখন ভয়ের বেড়াজাল থেকে মুক্ত করে আনন্দের চাদরে মুড়ে দেওয়া হয়, তখন তা কেবল একটি প্রক্রিয়া থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে মানবসত্তার স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশের এক চমৎকার মাধ্যম।মানবশিশুর জন্মগত বৈশিষ্ট্যই হলো কৌতূহল। সে চারপাশের প্রকৃতি, রঙ, শব্দ এবং গন্ধের মধ্য দিয়ে নতুন কিছু জানতে চায়, বুঝতে চায়। কিন্তু আমাদের প্রচলিত সমাজব্যবস্থা এবং প্রাচীন মেমোরি বেসড বা মুখস্থ নির্ভর শিক্ষাপদ্ধতি শিশুদের এই সহজাত কৌতূহলকে গলা টিপে হত্যা করে। ক্লাসরুমগুলো যেন একেকটি বন্দিশালা, যেখানে শিক্ষককের একঘেয়ে লেকচার আর মুখস্থ করার নিরন্তর তাড়া শিক্ষার্থীকে পড়াশোনার প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তোলে। এই ভীতিপ্রসূত পরিবেশে জ্ঞান অর্জনের চেয়ে নম্বর অর্জনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা মুখ্য হয়ে ওঠে। যখন একটি শিশু পরীক্ষার ভয়ে কুঁকড়ে থাকে বা হোমওয়ার্ক না করার অপরাধবোধে ভোগে, তখন তার মস্তিষ্কের সৃজনশীল অংশটি অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। এর বিপরীতে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ ধারণার মূল দর্শন হলো শিক্ষার্থীর মনস্তাত্ত্বিক স্বস্তি। আনন্দঘন পরিবেশে যখন কোনো বিষয় উপস্থাপন করা হয়, তখন মস্তিষ্কে ডোপামিন ও অক্সিডোসিনের মতো পজিটিভ হরমোন ক্ষরিত হয়, যা শেখার প্রক্রিয়াকে দীর্ঘস্থায়ী ও আকর্ষণীয় করে তোলে।আনন্দময় শিক্ষার প্রকৃত রূপ কেবল শ্রেণিকক্ষের চার দেওয়ালে সীমাবদ্ধ নয়; এটি প্রকৃতির বুক থেকে শুরু করে খেলার মাঠ এবং দৈনন্দিন জীবনের নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে বিস্তৃত। প্রাচীনকালে আমাদের দেশে বা গুরুগৃহে শিক্ষার পরিবেশ কেমন ছিল তা স্মরণ করলে দেখা যায়, উন্মুক্ত প্রকৃতি গাছের ছায়ায় গুরুর সান্নিধ্যে জীবনের পাঠ নেওয়া হতো খেলাধুলা, গল্প ও বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শান্তিনিকেতন বা বিশ্বভারতীর আদর্শে এই আনন্দময় শিক্ষার সুর স্পষ্টভাবে বেজে উঠেছিল, যেখানে ছাতিম তলার মুক্ত বাতাসে শিক্ষার্থীরা প্রকৃতির সান্নিধ্যে গান, নাটক ও সৃজনশীল কাজের মধ্য দিয়ে জ্ঞান অর্জন করত। আজকের দিনেও ফিনল্যান্ড বা জাপানের মতো উন্নত দেশগুলোর শিক্ষাব্যবস্থায় এই দর্শনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। সেখানে শিশুদের ওপর কোনো অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা হয় না, হোমওয়ার্কের বোঝা চাপানো হয় না, বরং খেলাধুলা, প্র্যাকটিক্যাল প্রজেক্ট এবং সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের ভেতরের প্রতিভা ফুটিয়ে তোলা হয়।আমাদের সমাজে প্রায়শই একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে যে, পড়াশোনায় আনন্দ যুক্ত হলে পড়াশোনার মান বা গুরুত্ব কমে যায়। অভিভাবকরা মনে করেন, শাসন, ভয়ভীতি এবং কড়া অনুশাসন না থাকলে সন্তান পড়ালেখা করবে না। এই ভ্রান্ত ধারণার কারণে শৈশব থেকেই শিশুদের ওপর এক নিষ্ঠুর মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হয়। খেলার মাঠ থেকে কেড়ে নিয়ে তাদের কোচিং সেন্টার আর প্রাইভেট মাস্টারের বেড়াজালে বন্দি করা হয়। ফলাফলস্বরূপ, আমাদের শিশুরা সার্টিফিকেটসর্বস্ব শিক্ষিত হয়ে উঠলেও তাদের মধ্যে মৌলিক চিন্তার শক্তি বা উদ্ভাবনী ক্ষমতা অনেক ক্ষেত্রেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারা মুখস্থ বিদ্যা দিয়ে পরীক্ষার গণ্ডি পার হতে পারলেও বাস্তব জীবনের জটিল সমস্যাগুলো সমাধান করতে গিয়ে হোঁচট খায়। অথচ আনন্দময় শিক্ষার মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান কখনো ভোলা যায় না, কারণ তা মানুষের হৃদয়ের গভীর গ্রথিত হয়ে যায়। যখন কোনো শিক্ষার্থী গণিতকে একটি ভয়ের বিষয় না ভেবে একটি আকর্ষণীয় ধাঁধা হিসেবে নেয়, বিজ্ঞানকে জটিল সূত্র না ভেবে চারপাশের রহস্য উদ্ঘাটনের আনন্দ হিসেবে দেখে, তখন পড়াশোনা আর বোঝা থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে পরম প্রাপ্তি।শিক্ষায় আনন্দের এই ধারা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে শিক্ষকদের ভূমিকা সবচেয়ে অগ্রণী। একজন শিক্ষক কেবল তথ্য সরবরাহকারী নন, তিনি একজন মেন্টর বা নির্দেশক যিনি শিক্ষার্থীর মনের ভেতর সুপ্ত থাকা সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তুলতে পারেন। গতানুগতিক মুখস্থ করানোর মানসিকতা থেকে বেরিয়ে শিক্ষকদের আধুনিক ও সৃজনশীল শিক্ষণ কৌশল আয়ত্ত করতে হবে। গল্পের ছলে কঠিন ব্যাকরণ বোঝানো, নাট্যাভিনয়ের মাধ্যমে ইতিহাসের কোনো ঘটনা ফুটিয়ে তোলা কিংবা বিজ্ঞানাগারের বাইরে খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে প্রকৃতি পর্যবেক্ষণের সুযোগ করে দেওয়া, এসব কৌশল শিক্ষাকে প্রাণবন্ত করে তোলে। যখন শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের ভুল করার স্বাধীনতা দেন এবং প্রতিটি ছোট সাফল্যকে উৎসাহ ও প্রশংসার সাথে বরণ করেন, তখন শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বেড়ে যায়। ভয়হীন ক্লাসরুমে শিক্ষার্থী প্রশ্ন করতে শেখে, যুক্তি দেখাতে শেখে এবং নিজের মতামত স্বাধীনভাবে প্রকাশ করার সাহস পায়।পরিবার হলো শিশুর প্রথম পাঠশালা এবং মা-বাবা হলো তার প্রথম শিক্ষক। তাই আনন্দময় শিক্ষার পরিবেশ তৈরিতে অভিভাবকদের মানসিকতার পরিবর্তন সবার আগে প্রয়োজন। সন্তানের রেজাল্ট নিয়ে প্রতিবেশী বা আত্মীয়স্বজনের সাথে অসুস্থ তুলনা করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সন্তান পরীক্ষায় কত নম্বর পেল তার চেয়ে বড় কথা হলো সে প্রতিদিন নতুন কিছু শিখতে পেরে আনন্দ পেল কি না, তা অনুধাবন করা জরুরি। ছুটির দিনে সন্তানকে সারাদিন পড়ার টেবিলে আটকে না রেখে তাকে খেলার মাঠে যেতে দেওয়া, বই পড়ার আনন্দ উপভোগ করানো এবং প্রকৃতির সাথে মেশার সুযোগ করে দেওয়া উচিত। যৌথ পরিবার কিংবা পারিবারিক আড্ডায় গল্প বলার মাধ্যমে পারিবারিক মূল্যবোধ ও নৈতিক শিক্ষা দেওয়ার যে ঐতিহ্য আমাদের সংস্কৃতিতে ছিল, তা ফিরিয়ে আনা দরকার। যখন ঘরে এবং বাইরে শিশু একটি নিরাপদ, স্নেহময় ও আনন্দঘন পরিবেশ পায়, তখন তার মানসিক বিকাশ সুষম হয়।ডিজিটাল যুগের এই সময়ে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমেও শিক্ষাকে দারুণভাবে আনন্দময় করে তোলা সম্ভব। অ্যানিমেশন, কার্টুন, শিক্ষামূলক ভিডিও গেম এবং ইন্টারঅ্যাক্টিভ অ্যাপস আজ শিক্ষার ধারণাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরে কার্টুনের চরিত্রের মাধ্যমে বর্ণমালা বা নামতা শেখানোর পদ্ধতি শিশুদের দারুণভাবে আকৃষ্ট করে। তবে এই ডিজিটাল মাধ্যম যেন আবার স্ক্রিন টাইমের অতিরিক্ত আসক্তিতে পরিণত না হয়, সেদিকেও সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। প্রযুক্তিকে সহায়ক শক্তি হিসেবে ব্যবহার করে পড়াশোনাকে আরও আকর্ষণীয় ও সহজলভ্য করে তোলা যেতে পারে, যা প্রথাগত পাঠ্যপুস্কের একঘেয়েমি দূর করতে দারুণ ভূমিকা রাখে।আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় আনন্দময় শিক্ষার এই ধারণাটিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য নীতিনির্ধারক ও শিক্ষা প্রশাসনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন শিক্ষাক্রমে পারফরম্যান্স-ভিত্তিক মূল্যায়ন এবং কন্টিনিউয়াস অ্যাসেসমেন্টের ওপর যে জোর দেওয়া হয়েছে, তা সঠিক ও আন্তরিকভাবে বাস্তবায়িত হলে মুখস্থ বিদ্যার অভিশাপ থেকে মুক্তি মিলবে। তবে এর পাশাপাশি শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, ক্লাসরুমের পরিবেশ উন্নয়ন এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত যুক্তিসঙ্গত পর্যায়ে নামিয়ে আনা জরুরি। বড় বড় শহরগুলোর পাশাপাশি মফস্বল ও গ্রামবাংলার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতেও যদি আনন্দময় শিক্ষার পর্যাপ্ত উপকরণ ও মনোরম পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়, তবেই সত্যিকার অর্থে শিক্ষার সুফল সর্বস্তরের মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাবে।একটি জাতির মেরুদণ্ড শক্তিশালী করার জন্য প্রয়োজন একটি সুস্থ, সবল ও সৃজনশীল প্রজন্ম। যে শিশু শৈশবে আনন্দ নিয়ে পড়াশোনা করতে শেখে, সে বড় হয়ে একজন কৌতূহলী গবেষক, দক্ষ পেশাজীবী এবং মানবিক গুণসম্পন্ন আদর্শ নাগরিক হয়ে গড়ে ওঠে। ভীতি ও প্রতিযোগিতার যাতাকলে পিষ্ট হয়ে আমাদের আগামী ভবিষ্যৎ যেন হারিয়ে না যায়, সেদিকে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি সচেতন নাগরিককে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। শিক্ষাকে কোনো শাস্তিমূলক বাধ্যবাধকতা নয়, বরং জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য আনন্দের অনুষঙ্গ হিসেবে গ্রহণ করার সময় এখনই। আসুন, আমরা সকলে মিলে এমন একটি শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলি যেখানে প্রতিটি শিশুর শৈশব হাসিখুশিতে মুখরিত থাকবে এবং জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে পড়বে প্রতিটি হৃদয়ে আনন্দ ও উদ্দীপনার স্ফুলিঙ্গ হয়ে।

The Dhaka News Bangla

সম্পাদক: তাসকিন আহমেদ রিয়াদ 

কপিরাইট © ২০২৬ The Dhaka News Bangla । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত