চাঁদপুর পৌর প্রশাসকের বিরুদ্ধে কাজ ছাড়াই পুরাতন প্রকল্প দেখিয়ে ২০ লাখ টাকা লোপাটের অভিযোগ
চাঁদপুর পৌরসভায় গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর) প্রকল্পের আওতায় কোনো কাজ না করেই পৌরসভার অর্থায়নে টেন্ডারে বাস্তবায়িত প্রকল্প দেখিয়ে প্রায় ২০ লাখ টাকা লোপাট চেষ্টার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বর্তমান পৌর প্রশাসক এরশাদ উদ্দিন এবং ভাণ্ডার রক্ষক ফয়সালের বিরুদ্ধে এই লুটপাটের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এমনকি তথ্য অধিকার আইনে এ সংক্রান্ত তথ্যের জন্য আবেদন ফরম জমা দিতে গেলে এক সাংবাদিককে বহিরাগতদের দ্বারা মারধর করার অভিযোগও উঠেছে প্রশাসকের বিরুদ্ধে।অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে টিআর কর্মসূচির দ্বিতীয় কিস্তিতে চাঁদপুর পৌরসভার জন্য বরাদ্দ আসে ২১ লাখ ২৭ হাজার ৩৩০ টাকা। কাগজ-কলমে এই অর্থ দিয়ে কয়েকটি নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা বলা হলেও বাস্তবে দেখানো হয়েছে সাবেক প্রশাসক গোলাম জাকারিয়ার আমলে সম্পন্ন হওয়া কাজগুলো। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, যেসব কাজকে বর্তমান প্রকল্পের অংশ হিসেবে দাবি করা হচ্ছে, সেগুলো অন্তত ৪-৫ মাস আগে টেন্ডারের মাধ্যমে পৌরসভার নিজস্ব অর্থায়নে সম্পন্ন হয়েছে।প্রকল্প এলাকায় সরেজমিনে ঘুরে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, এসব কাজ ৪-৫ মাস আগেই সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমান প্রশাসক এরশাদ উদ্দিনের সময়ে এখানে নতুন করে কোনো কাজ হয়নি।২০২৫-২৬ অর্থবছরে চাঁদপুর পৌরসভায় এসব প্রকল্পে প্রথম পর্যায়ে মোট বরাদ্দ ছিল ২১ লাখ টাকা এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে ২২ লাখ ৭৭ হাজার ৩৩০ টাকা। এর মধ্যে একটি মসজিদে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।প্রকল্পের পরিপত্র অনুযায়ী, কাজ শুরুর আগে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প, কমিটির নাম ও বরাদ্দের পরিমাণ উল্লেখ করে সাইনবোর্ড স্থাপন বাধ্যতামূলক হলেও বাস্তবে কোনো প্রকল্প এলাকায় এর অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। অনুসন্ধানে এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে চাঁদপুর পৌরসভার প্রশাসক এরশাদ উদ্দিন এবং ভান্ডার রক্ষক ফয়সালের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠে এসেছে।এদিকে, তথ্য অধিকার আইনে তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে গত ২৮ এপ্রিল পৌর প্রশাসক এরশাদ উদ্দিন দৈনিক ভোরের আকাশ ও বাংলা এডিশনের জেলা প্রতিনিধি আবেদনকারী মুসাদ্দেক আল আকিবকে বহিরাগতদের দিয়ে মারধরের অভিযোগ ওঠে। এরশাদ উদ্দিন এ ঘটনায় মারধরের বিষয়টি অস্বীকার করে ‘কথাকাটাকাটি’ হয়েছে বলে দাবি করেন। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী জেলা প্রশাসকের কাছে অভিযোগ দিয়েছেন।অভিযোগ ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে এবং অর্থ লোপাটে ব্যর্থ হয়ে পৌর প্রশাসক এরশাদ উদ্দিন ও তার মদদ পুষ্ট চক্র পৌরসভার কর্মচারীদের নামে বেনামি প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে।গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর) কর্মসূচির আওতায় দ্বিতীয় কিস্তির উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে চাঁদপুর পৌরসভার পূর্বে বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলো দেখানো হয়েছে। এসব কাজ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে পৌরসভার অর্থায়নে ঠিকাদারের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছিল। তখন প্রশাসকের দায়িত্বে ছিলেন স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক গোলাম জাকারিয়া।অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে গোলাম জাকারিয়ার স্থলাভিষিক্ত হয়ে বর্তমান প্রশাসক এরশাদ উদ্দিন পূর্বের কাজ দেখিয়ে টিআর প্রকল্পের ২০ লাখ টাকার বেশি আত্মসাতের পরিকল্পনা করেন।উল্লেখিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে-চাঁদপুর স্টেডিয়াম রোডে ইলিশ চত্বর মেরামত ও সংস্কার (৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা), দোকানঘর রাস্তা মাটি ভরাট ও সংস্কার (৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা), স্টাফ কোয়ার্টার পার্কে রাস্তা সংস্কার ও নির্মাণ (৪ লাখ টাকা), স্টাফ কোয়ার্টার পার্কে মাটি ভরাট ও উন্নয়ন (৪ লাখ টাকা), পুরান বাজার পাবলিক টয়লেট ও পোল মেরামত (৩ লাখ ৭ হাজার ৩৩০ টাকা ৭৭ পয়সা) সহ মোট ২০ লাখ ৭ হাজার ৩৩০ টাকা লোপাটের চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।স্টাফ কোয়ার্টার পার্কের দারোয়ান আব্দুল লতিফ পাটোয়ারী বলেন, “বর্তমান প্রশাসকের আমলে এখানে কোনো কাজ হয়নি। তবে সাবেক প্রশাসক গোলাম জাকারিয়ার সময়ে কিছু কাজ হয়েছিল, যা ঠিকাদারের মাধ্যমে করা হয়।”সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ইমাম হোসেন মিয়াজি জানান, “আমার লাইসেন্সে কাজটি পেয়েছিলাম, তবে কাজটি সহকারী ঠিকাদার শাহাদাত করেছেন।”সহকারী ঠিকাদার শাহাদাত বলেন, “আমি ৪-৫ মাস আগে টেন্ডারের মাধ্যমে কাজটি নিয়েছি। এখনো বিল পাইনি। এটি টিআর প্রকল্প নয়, পৌরসভার অর্থায়নে হয়েছে।”জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ইলিশ চত্বরটি পুনরায় সংস্কার করে উদ্বোধন করা হয়।ইলিশ চত্বর সংস্কার প্রসঙ্গে একাধিক ঠিকাদার জানান, কাজগুলো ভাঙা, টাইলস বসানো, পানির ফোয়ারা, মোটর ও বৈদ্যুতিক লাইন মেরামতের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে এবং এটি পৌরসভার অর্থায়নে করা হয়েছে।উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দ্বিতীয় পর্যায়ে ২১ লাখ ২৭ হাজার ৩৩০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।চাঁদপুর পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী সুজিত বড়ুয়া বলেন, “এ বিষয়টি ভান্ডার রক্ষক ফয়সাল দেখেন। এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না। তথ্য জানতে হলে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করতে হবে।”অনুসন্ধানে জানা যায়, টিআর প্রকল্পটি ভান্ডার রক্ষক ফয়সাল তদারকি করতেন। তিনি দাবি করেন, “প্রথম পর্যায়ে ১৩টি প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে এবং দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজও সম্পন্ন হয়েছে।” তবে কারা কাজ পেয়েছেন-এ বিষয়ে তিনি স্পষ্ট তথ্য দিতে পারেননি। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, কাবিখা-কাবিটা প্রকল্পে একজন ব্যক্তি একাধিক প্রকল্পের সভাপতি হতে পারেন না। অথচ বাস্তবে একাধিক প্রকল্পে একই ব্যক্তির সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া গেছে।সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, “ইলিশ চত্বরের কাজ টেন্ডারের মাধ্যমে হয়েছে এবং এতে টিআর প্রকল্পের কোনো অর্থ ব্যবহার হয়নি।”উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) আফতাবুল ইসলাম বলেন, “এ প্রকল্পটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কার। ২ ডিসেম্বর ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় থেকে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে ৩০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দুই দফায় ৯০ লাখ টাকা বরাদ্দ হয়েছে। ৩১ মার্চ কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বৃষ্টির কারণে জুন ২০২৬ পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়েছে।”উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম এন জামিউল হিকমা বলেন, “আমরা ৫০ শতাংশ টাকা ছাড় করেছি। কাজ শেষে সাইনবোর্ড স্থাপন করে ছবি জমা দিতে হবে এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সরেজমিন পরিদর্শন করবেন। কোনো প্রকল্পের কাজ না হলে অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং প্রয়োজনে অর্থ ফেরত নেওয়া হবে।”বিধি অনুযায়ী তথ্য অধিকার আইনে উপরোক্ত প্রকল্পের তথ্য চেয়ে আবেদন করতে গিয়ে সাংবাদিকের উপর হামলার ঘটনায় ইতোমধ্যে বিষয়টি পুরো জেলা জুড়ে সর্বমহলে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। এ ধরনের দুর্নীতির সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন চাঁদপুরের সচেতন মহল।